দোজখের ভয়াবহ আযাবের বর্ণনা

সারা আকাশ-জমিন এবং তন্মধ্যেবর্তী দ্রব্যসমূহ তৈরি করার পর আল্লাহ তায়ালা তাহতাচ্ছারা নামক স্থানটি কাদা মাটি দিয়ে সৃষ্টি করলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, ছারা নামক একটি বিশালাকৃতি বিশিষ্ট পাথরের নীচে দোজখকে স্হাপন করা হয়েছে। দোজখের ব্যবস্হাপনা ও তত্ত্বাবধান করার জন্য মালিক নামক এক ফেরেশতা সরদার পদে নিযুক্ত রয়েছেন। তার অধীনে রয়েছে ঊনত্রিশ জন ফেরেশতা।  এদের প্রত্যেকের ডানে বামে হাত রয়েছে সত্তর হাজার করে মোট একশত চল্লিশ হাজার।

প্রত্যেকটি হাতে তালু রয়েছে সত্তর হাজার। আর প্রত্যেকটি তালুতে সত্তর হাজার করে রয়েছে আঙ্গুল। প্রত্যেকটি আঙ্গুলের মাথায় আছে একেকটি অজগর এবং প্রতিটি অজগরের মাথায় আছে একেকটি সাপ। সাপগুলো এত বড় যে তার প্রত্যেকটির দৈর্ঘ্য হবে সত্তর হাজার বছরের পথের সমান। সাপগুলোর প্রত্যেকটির মাথার উপরে আছে একেকটি ভীষণ বিষধর বিচ্ছু। এরা দোজখীদের একবার দংশন করলেই তারা বিষের জ্বালায় অস্থির হয়ে যাবে ও যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকবে।

কিন্তু এই ভয়ানক বিষধর বিচ্ছুগুলো তাদেরকে বারবার দংশন করতে থাকবে। এই ধরনের ফেরেশতা তৈরি করে আল্লাহ তাদেরকে হুকুম করলেন,ওহে ফেরেশতারা! তোমরা দোজখের মধ্যে প্রবেশ কর।তারা জবাব দিবে, ওহে মাবুদ! দোজখের আগুনের ভয়াবহতা দেখে আমরা দারুণ আতঙ্কিত এবং ভীতিগ্রস্ত। সুতরাং এর মধ্যে প্রবেশ করতে আমাদের কিছুতেই সাহস হচ্ছে না। তাদের কথা শুনে আল্লাহ জিবরাইল ফেরেশতাকে হুকুম করলেন, জিবরাইল! তুমি বেহেশতে রক্ষিত কালেমা তাইয়্যেবা লিখিত সেই আংটিটি নিয়ে এসো এবং ফেরেশতাদের ললাটে ছাপ লাগিয়ে দাও।

জিবরাইল আল্লাহ তায়ালার  আদেশ পালন করলেন। তখন সেই ফেরেশতারা দোজখের মধ্যে প্রবেশ করলো। এই কালেমার বরকতে দোজখের আগুন আর তাদের স্পর্শ করলো না।এভাবে হযরত রাসুল (সাঃ)-এর যে উম্মত নিজের মনের কপালে কালেমায় তাইয়্যেবা একে রাখবে তাকে কখনও দোজখের আগুন স্পর্শ করতে পারবে না।দোজখকে সাতটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। এর একেকটি স্তর  নির্ধারিত রয়েছে একেক শ্রেণির লোকের জন্য।

স্তরগুলো নাম হলো

(১) জাহিম,

(২) জাহান্নাম,

(৩) সাকার,

(৪) সাঈর,

(৫) লাজা,

(৬) হাবিয়া এবং

(৭) হুতামা।

হযরত আবদুল্লাহ বলেন, ফেরেশতা জিবরাইল (আঃ) হযরত রাসুল (সাঃ) - কে যখন দোজখ সম্পর্কিত এসব বর্ণনা শুনাচ্ছিলেন, তখন সমস্ত জগৎ ব্যাপি একটি ভীষণ আওয়াজ শুনা গেল এবং সমস্ত জমিন,পাহাড় প্রান্তর থরথর করে কেঁপে উঠলো। সে আওয়াজ শুনে হযরত রাসুল (সাঃ)- এর চেহারা মোবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি ফেরেশতা জিবরাইল কে জিজ্ঞেস করলেন,

ওহে জিবরাইল! তুমি বলতে পার কি এ কিসের আওয়াজ শুনা গেল? জিবরাইল( আঃ) বললেন, আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম( আঃ)- কে সৃষ্টি করার সত্তর হাজার বছর আগে একটি বড় পাথর সৃষ্টি করেছিলেন।  তা দোজখের এক কিনারায় অবস্থিত ছিল। পাথরটির ওজন হবে অন্যূন সত্তর হাজার মণ। উক্ত পাথরখানা সত্তর হাজার বছর আগে দোজখের মধ্যে গড়িয়ে পড়ে নিম্নদেশে পড়ছিল এবং তা এইমাত্র গিয়ে হাবিয়া দোজখের তলদেশ স্পর্শ করলো। আর তাতেই আমরা এরকম শব্দ শুনলাম। জিবরাইল (আঃ)- এর কথা শুনে রাসূল (সাঃ) তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করলেন, ওহে জিবরাইল!  বলতো,দোজখের এসব নিম্ন স্হলে কোন শ্রেনির লোক অবস্থান করবেজিবরাইল (আঃ) বললেন, দোজখের এই স্হানটিতে মুনাফেকদের জায়গা হবে। রাসূল (সাঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, হে জিবরাইল! তুমি যে দোজখের বিভিন্ন স্তরের কথা বললে, তার কোন স্তরে কোন শ্রেনির লোকদের স্থান হবে?

 জিবরাইল (আঃ) বলতে লাগলেন, যারা আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকারকারী কাফির এবং আল্লাহ তায়ালার সাথে শরীক স্হাপনকারী মুশরেক, মূর্তিপূজা করে তারা জাহান্নামে স্থান লাভ করবে। 'সাকার' নামক দোজখে স্থান লাভ করবে ইয়াহুদি ও নাছারাগণ, অগ্নি উপাসগণ। আর যারা ঈমান আনা সত্বেও শয়তানের তাবেদারী করে তারা 'লাজা' দোজখের অধিবাসী।  আর যারা সুদ- ঘুষ খায় ও বড় বড় পাপে লিপ্ত তারা হুতামার অধিবাসী। আর 'সাঈর' দোজখে স্থান লাভ করবে মূর্তি পূজকগণ। আর হে নবী! আপনার গুনাহগার উম্মত প্রবেশ করবে 'জাহীম' নামক দোজখে।

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, সাধারণ পযার্য়ের অগ্নিকে এক হাজার বছর ধরে তেজ বৃদ্ধি করতে করতে তা লালবর্ণ ধারণ করলো। পুনরায় এক হাজার বছর ধরে এটার তেজ বর্ধিত করা হলো। এবার এটা ঘোর কাল রং ধারণ করলো। আর কোন দিন দোজখের অগ্নির এই রং পরিবর্তিত হবে না- কেয়ামত পর্যন্ত এই কালো রং-ই থাকবে। সেই ভীষণ কালো রং বিশিষ্ট অগ্নিপূর্ণ দোজখের মুখে আল্লাহ একখানা পাথর চাপা দিয়ে রেখেছেন। আর একখানা বিশাল পাথর বানিয়ে তা দোজখের নীচে স্হাপন করেছেন। উক্ত পাথরখানা এক ফেরেশতা তার মাথার উপর ধারণ করে রয়েছে। ঐ ফেরেশতা দাঁড়িয়ে আছে একটি মশার পিঠের উপর। মশাটি দণ্ডায়মান আছে সিক্ত মাটির উপর। উক্ত সিক্ত মাটি রয়েছে একটি বড় গাভীর শিংয়ের উপর। গাভীটির মাথায় আছে সত্তর হাজার শিং। গাভীটি রয়েছে একটি বিশাল মাছের পিঠে দণ্ডায়মান। মাছটি এতই বড় যে, এটার সুদীর্ঘ লেজ গিয়ে আরশের পায়া স্পর্শ করেছে। গাভীটিকে যথাস্থানে স্হির রাখার উদ্দেশ্য আল্লাহ একটি অতি বৃহৎ মশা সৃষ্টি করে এটার কাছে রেখেছেন। গাভীটি সেই মাথার ভয়ে সামান্য মাত্র নড়াচড়া না করে একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যদি সে গাভীটি সামান্য মাত্র নড়াচড়া করতো তাহলে কখন না জানি এই বিশ্ব সংসার লন্ডভন্ড হয়ে যেত।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.